ঢাকা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং | বঙ্গাব্দ

ঢাবিতে শিবিরের হলে হলে ‘সমন্বয়ক’ বসানো: ছাত্রনেতাদের মতে ‘প্রতারণা’, আর শিবিরের ‘কৌশলগত প্রয়োজন’

প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ইং

ছবির ক্যাপশন:
ad728

বাংলার প্রতিচ্ছবি: হল সংসদ নির্বাচন ও ডাকসুর গণতান্ত্রিক চর্চার আবহের বদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এখন নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ। ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সোচ্চার স্লোগান, গোপন কিংবা প্রকাশ্যে কমিটি দেওয়ার দ্বিমুখী বিতর্ক এবং সবশেষে হঠাৎ করেই হল ও অনুষদে ‘সমন্বয়ক’ পদায়ন। ক্যাম্পাসে নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এ যেন পুরোনো রাজনীতির গায়ে নতুন মোড়ক—যা নিয়ে ঢাবির ছাত্ররাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ ও সম্পর্কের চরম টানাফোড়ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমন্বয়ক বসানোকে সংগঠনটির ‘প্রতারণা ও মিথ্যাচারের’ নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ছাত্রনেতারা। তাদের মতে, হলে হলে ও অনুষদে আধিপত্য বিস্তার করতেই সংগঠনটি এই নতুন পথ বেছে নিয়েছে।

তবে ছাত্রশিবিরের দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সুসংগঠিত করার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৯ সেপ্টেম্বর, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ১২টি আবাসিক হল ও ৬টি অনুষদে সমন্বয়ক পদে মোট ১৮ জনের নাম ঘোষণা করে ইসলামী ছাত্রশিবির। উল্লেখ্য, এই সিদ্ধান্তের ঠিক ১৩ মাস আগে ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট হলগুলোতে আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শিবিরের এই পদে বসানোর খবরে ওই রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিলে নামেন একদল শিক্ষার্থী, যারা পরবর্তীতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। ওই আন্দোলনের পর তৎকালীন উপাচার্য নিয়াজ আহমদের কাছ থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের মৌখিক ঘোষণা এলেও কোনো দাপ্তরিক আদেশ জারি হয়নি। ছাত্রদলের অভিযোগ ছিল, শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল শিবিরের নেতাকর্মীরা।

হলে হলে সমন্বয়ক বসানোর ব্যাখ্যায় ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল মারুফ বলেন, ‘প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি চলবে কিনা, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের দেয়নি। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখছি হল প্রশাসন একপাক্ষিকভাবে একটি নির্দিষ্ট দলকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে দাওয়াত দিচ্ছে। তাই আমাদের প্রতিনিধিত্বের জন্য বাধ্য হয়ে আমরা সমন্বয়ক দিয়েছি।’ কমিটি গোপন রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত।’

শিবিরের এই পদক্ষেপকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন অন্য ছাত্রসংগঠনের নেতারা।

জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ আল মুদাসসির বলেন, ‘ছাত্রলীগের আমল থেকেই হলভিত্তিক এমনকি ভবনভিত্তিক কমিটি আছে ছাত্রশিবিরের। তারা সেগুলো প্রকাশ না করে নতুন করে সমন্বয়ক দিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আমরা বলব, প্রতারণা না করে কমিটিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করুন।’

একই অভিযোগ তুলে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘ছাত্রশিবিরের রাজনীতি চলে মিথ্যার ওপর ভর করে। তারা আগস্টের পর যা বলেছে, বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা করেছে। প্রশাসন যখন ডাকসু নিয়ে হলভিত্তিক আলোচনা শুরু করেছে, তখন তারা বাধ্য হয়ে সমন্বয়কের নাম দিয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্পষ্ট প্রতারণা।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী শিবিরের এই পদক্ষেপকে ‘দ্বিচারিতা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘ছাত্রশিবির পূর্বে নাম-বেনামে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলেছিল কেবল নিজেদের একক দখলদারিত্ব কায়েম করার স্বার্থে। আজ তাদের মুখোশ খুলে গেছে।’

জাসদ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের ম্যান্ডেট না চেয়ে হলে হলে সমন্বয়ক বসানো নির্বাচিত ছাত্র সংসদকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প সাংগঠনিক বলয় তৈরির চেষ্টা। শিক্ষার্থীরা এই পুরোনো আধিপত্যের রাজনীতি চিনতে ভুল করবে না।’

উল্লেখ্য, ছেলেদের ১২টি হল ও ৬টি অনুষদে সমন্বয়ক দেওয়া হলেও ছাত্রীদের হলে কোনো সমন্বয়ক দেয়নি ছাত্রশিবির। এ বিষয়ে শিবিরের প্রতিনিধি জানান, তাদের সাংগঠনিক কাঠামো শুধু ছাত্রদের জন্য হলেও সমাদর্শী নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাদের বৈचारिक ঐক্য রয়েছে, তবে সরাসরি সাংগঠনিক যোগসূত্র নেই।

কমেন্ট বক্স