ঢাকা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং | বঙ্গাব্দ

টিকা না নেওয়া ও পুষ্টিহীনতাই প্রধান কারণ: চট্টগ্রামে হামের গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ইং

ছবির ক্যাপশন:
ad728

বাংলার প্রতিচ্ছবি: হাসপাতালের করিডোরে শিশুদের কান্নার শব্দ, একটিমাত্র বিছানায় গাদাগাদি করে থাকা একাধিক শিশু আর স্বজনদের চোখে শঙ্কার ছাপ। কোনোটি বয়সের আগে আকস্মিক সংক্রমণে আক্রান্ত, আবার কোনোটি হাসপাতালে এসে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে হামে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাব কেবল একটি ভাইরাসের গল্প নয়; এটি তুলে ধরছে পুষ্টির ঘাটতি, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং টিকাদানের সার্বিক চিত্রে থাকা এক গভীর সংকটের মুখ।

হামে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২০০ শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১৬৭ জনই (৮৩.৫ শতাংশ) কোনো টিকা নেয়নি। এমনকি সংক্রমিত শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৯.৪ শতাংশ) কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে।

বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব: রোগের বিস্তার, উপসর্গ, জেনেটিক বিশ্লেষণ ও মা-শিশুর অ্যান্টিবডির অবস্থা’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআইএফ) এই গবেষণা পরিচালনা করে।

গবেষণায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২০০ শিশু ও ১০০ জন মায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গ্রামে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বেশি আক্রান্ত

গবেষণার ফল তুলে ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান পর্যবেক্ষক (প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর) ডা. কামরুন নাহার জানান, আক্রান্ত ২০০ শিশুর মধ্যে ১৪৮ জনই (৭৫.৫ শতাংশ) গ্রামীণ এলাকার এবং ১২৭ জন (৬৪.৮ শতাংশ) নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবারের।

তিনি বলেন, ‘প্রাদুর্ভাবের বড় একটি অংশ গ্রামীণ এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা প্রমাণ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই ভাইরাসের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি

গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। ১৮.৯ শতাংশ শিশুকে বুকের দুধের বাইরে অন্য খাবার দেওয়ায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া আক্রান্তদের মাত্র ৩২ শতাংশ (৬৩ জন) গত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল। যেসব শিশু ভিটামিন ‘এ’ পায়নি, তাদের ৫৯ শতাংশের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।

টিকার বয়সের আগেই আক্রান্ত

আক্রান্ত ১৬৭ জন টিকাহীন শিশুর মধ্যে ৯১ জনই নির্ধারিত বয়সে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশে সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয়। তবে গবেষণায় আক্রান্তদের ৪৬ শতাংশের বয়সই ছিল ৯ মাসের নিচে। সামগ্রিকভাবে আক্রান্তদের বয়স ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

টিকা না নেওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ৫২ শতাংশ পরিবারের অসচেতনতা বা তারিখ ভুলে যাওয়া, ৩০ শতাংশ শিশুর অসুস্থতা, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতা এবং বাকিরা ভয় বা কার্ড হারানোর কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে সংক্রমণ

গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৯.৪ শতাংশ শিশুই অন্য কোনো চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে হামে সংক্রমিত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, শয্যা স্বল্পতার কারণে একই বিছানায় একাধিক রোগী রাখা হচ্ছে। ফলে শনাক্ত হওয়ার আগেই অন্য রোগের রোগীদের মধ্যেও দ্রুত হাম ছড়িয়ে পড়ছে। সংক্রমণ কমাতে চট্টগ্রামে হামের জন্য পৃথক ডেডিকেটেড হাসপাতাল বা আলাদা আইসোলেশন চালুর জোর দাবি জানান বিশেষজ্ঞরা।

নতুন ধরন নেই, জেনোটাইপ ‘বি-থ্রি’

আক্রান্তদের ১৭ জনের নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিং করে ‘বি-থ্রি’ জেনোটাইপ শনাক্ত করা হয়েছে, যা বিদ্যমান টিকার মাধ্যমেই পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। ডা. কামরুন নাহার জানান, নতুন কোনো জেনোটাইপ পাওয়া যায়নি। সার্বিক টিকাদান কমে যাওয়াতেই এই প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বিসহ চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা উপস্থিত ছিলেন।

কমেন্ট বক্স