বাংলার প্রতিচ্ছবি. প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার লক্ষীখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই যেন চোখে পড়ে এক দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র। দেয়ালের পলেস্তার খসে পড়ছে, পিলারে ফাটল, ছাদের অংশ ঝুঁকিপূর্ণ—সব মিলিয়ে একটি অনিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু এই দৃশ্যের চেয়েও বেশি নাড়া দেয় শিশুদের নিস্তব্ধ মুখ, যেখানে থাকার কথা ছিল হাসি, কোলাহল আর শেখার আনন্দ।
এই বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারে গত ১৬ বছর ধরে একই সঙ্গে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম ও পুলিশ ফাঁড়ির দাপ্তরিক কাজ। ফলে একটি স্বাভাবিক শিক্ষাঙ্গন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক অস্বস্তিকর ও ভীতিকর পরিবেশে। বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার তিনটি শ্রেণিকক্ষ পুলিশ ফাঁড়ির দখলে থাকায় শিক্ষার্থীদের নিচতলায়, মূলত দুর্যোগকালে গবাদি পশুর আশ্রয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে, টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি অস্থায়ী কক্ষে ক্লাস করতে হচ্ছে।
এসব কক্ষে নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নেই বৈদ্যুতিক ফ্যান, নেই স্বাস্থ্যসম্মত বসার ব্যবস্থা। গরমে হাঁসফাঁস করা পরিবেশে শিশুদের ক্লাস করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এক পাশে ক্লাস নিলে অন্য পাশের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়, ফলে পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটে নিয়মিত। শিক্ষকরা বলছেন, এতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীরা রানী তাফালী জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১২৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, কিন্তু তাদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষার পরিবেশও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও এখানে সেই পরিবেশ নেই। একদিকে শব্দদূষণ, অন্যদিকে অবকাঠামোগত দুর্বলতা—সব মিলিয়ে আমরা খুব সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছি।”
বিদ্যালয়ের স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য থাকা বাথরুমগুলোর কোনো কোনোটি দরজাবিহীন, কোথাও পানির সংযোগ নেই। শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যদের জন্য ব্যবহৃত বাথরুমটিও অচল অবস্থায় রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের।
অভিভাবকদের অভিযোগ, একই ভবনে পাঠদান, সালিশ কার্যক্রম এবং পুলিশের নিয়মিত যাতায়াত—সব মিলিয়ে একটি “পুলিশি পরিবেশ” তৈরি হয়েছে। এতে শিশুরা মানসিকভাবে চাপে থাকছে। অনেকেই ভয়ে চুপচাপ থাকে, স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা বা অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারছে না। এমনকি লাইব্রেরিতে যেতেও তারা ভয় পায়—যদি কোনো কারণে পুলিশ কিছু বলে।
শিক্ষকদের মতে, শিশুদের শৈশবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা এমন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। “পুলিশ কাঁধে অস্ত্র আর শিক্ষার্থীর হাতে বই—এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে চলা কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়,”—বলছেন প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের বর্তমান জনবল অনুযায়ী এখানে ৩ জন নারী ও ২ জন পুরুষ শিক্ষক এবং একজন অফিস সহায়ক কর্মরত আছেন। কিন্তু সীমিত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার কারণে তারা শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দিতে পারছেন না।
এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান জানান, লক্ষীখালী অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং নতুন ভবন নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, “নতুন ভবন তৈরি হলে দ্রুত পুলিশ ফাঁড়ি বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।”
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. শেফাইনূর আরেফিনও স্বীকার করেন, একই ভবনে শিক্ষা ও পুলিশি কার্যক্রম চলা অনুচিত। তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—১৬ বছরেও যখন সমাধান হয়নি, তখন নতুন করে দেওয়া আশ্বাস কতটা বাস্তবায়িত হবে? তাদের দাবি, আর বিলম্ব নয়—শিশুদের নিরাপদ, ভীতিমুক্ত ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, একটি প্রজন্মের শৈশব ও ভবিষ্যৎ কোনোভাবেই অবহেলার মধ্যে আটকে থাকতে পারে না।