বাংলার প্রতিচ্ছবি : সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। ইতোমধ্যে পে-কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে চেয়ারম্যানের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতির কারণে এখনই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে না তারেক রহমানের সরকার।
সূত্রমতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর কৃচ্ছতা সাধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিদেশ ভ্রমণ, নতুন গাড়ি ও কম্পিউটার কেনাসহ সব ধরনের বিলাসী প্রকল্প পরিহারের নির্দেশনা রয়েছে। এমন অবস্থায় নতুন পে-স্কেলের বিশাল ব্যয়ভার বহন করা এই মুহূর্তে সমীচীন মনে করছে না সরকার। এদিকে, পে-স্কেলের জন্য বরাদ্দ থাকা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ফ্যামিলি কার্ডের ভর্তুকি খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে—এমন খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর প্রতিবাদে তারা ইতোমধ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির এশীয় অঞ্চলের প্রধান কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে জানান, এই মুহূর্তে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া সরকারের ব্যাংক ঋণ ও রাজস্ব ঘাটতির চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সরকারের ব্যাংক ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং এনবিআরের তথ্যমতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার উপরে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মনে করছে, আগের সরকারের প্রস্তাবিত পে-কমিশনের প্রতিবেদনকে সরাসরি গ্রহণ না করে তা কেবল একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সংস্থাটির মতে, বিদায়ী সরকারের রেখে যাওয়া এই দায় বর্তমান সরকারের ওপর এক ধরনের ‘প্রলম্বিত চাপ’ তৈরি করেছে। এমন জটিল সমীকরণের মধ্যেই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে ৫ এপ্রিল রবিবার থেকে ১০ এপ্রিল শুক্রবার পর্যন্ত টানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদান এবং জেলা-বিভাগীয় শহরে প্রতিনিধি সমাবেশ।
সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও নতুন পে-স্কেল দেওয়া হয়নি। নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার খরচ কয়েকগুণ বাড়ায় সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা এখন খাদের কিনারে। তাই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রেখে দ্রুত পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি। তবে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল দেওয়ার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের কোনো অবকাশ নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্দোলনের চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।