বাংলার প্রতিচ্ছবি: কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে আধিপত্য বিস্তার, মাদক চোরাচালান ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রক্তাক্ত সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত বুধ ও মঙ্গলবার (৫ ও ৬ মে) পরপর দুই দিনে দুই সশস্ত্র নেতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ক্যাম্পগুলোতে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি সংস্থার কর্মীদের মধ্যেও চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।
টানা দুই দিনের হত্যাকাণ্ড: গত বুধবার (৬ মে) উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৮ পশ্চিমে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ছোট ভাই মোহাম্মদ কামালকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। নিহত কামাল ওই ক্যাম্পের বি-৪১ ব্লকের মাঝির দায়িত্বে ছিলেন। এর ঠিক আগের দিন ৫ মে সন্ধ্যায় উখিয়ার ক্যাম্প-৭-এ আরসা নেতা কেফায়েত উল্লাহ হালিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একসময় নবী হোসেনের সহযোগী থাকলেও পরবর্তীতে ‘এআরও’ নামে আলাদা বাহিনী গড়ে তোলায় হালিম প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়েন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সক্রিয় ছয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধের ধরন: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে আরসা ও আরএসওসহ মোট ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। মাদক চোরাচালান, অপহরণ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণই তাদের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে কুখ্যাত সন্ত্রাসী নবী হোসেনের নেতৃত্বে প্রতি মাসে ক্যাম্পগুলোতে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার ইয়াবা ও ‘আইস’ প্রবেশ করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ৯টি সন্ত্রাসী বাহিনীর সহযোগিতায় উখিয়া ও টেকনাফের বিশাল মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করে এই নবী হোসেন বাহিনী।
কারাগার থেকে ফিরে পুনরায় সক্রিয়: ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এই সন্ত্রাসীদের অনেকেই বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হলেও সম্প্রতি কারামুক্ত হয়ে পুনরায় ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরি করছে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, নবী হোসেন কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও তার গ্রুপকে শক্তিশালী করেছেন। এছাড়া আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি, মাস্টার আইয়ুব ও মৌলভী রফিকের নেতৃত্বে আলাদা আলাদা গোষ্ঠী মাদক ও অস্ত্রের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের একাংশের দাবি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতেই একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই সংঘাত উসকে দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত ১৪ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মৃত্যুঞ্জয় সজল জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর পর জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন, চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত নির্মূল করা না গেলে সহিংসতা ও প্রাণহানির এই ধারা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।