ঢাকা | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | বঙ্গাব্দ

সৃজনশীল সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি মাজেদুল হক বিরহের নান্দনিক রূপকার

প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৬, ২০২৬ ইং

ছবির ক্যাপশন:
ad728
বাংলার প্রতিচ্ছবি : বিরহী কবি উপাধিতে ভূষিত, সমধিক খ্যাত ও সমাদৃত ছান্দসিক রীতির সুপরিচিত জনপ্রিয় কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল সাহিত্যের ধ্রুপদী স্বপ্নদ্রষ্টা।

প্রথাগত ছন্দে ও আধুনিক গদ্যছন্দে তিনি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা, সৃষ্টি করেছেন
নতুন ছন্দরীতি বা ছন্দ কাঠামো। লিখেছেন স্বতন্ত্র  ছন্দরীতিতে নান্দনিক কবিতা।

ছন্দরীতির সৃজনশীলতা সম্পর্কে কবি তাঁর ছন্দরীতি শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

ছন্দরীতি 

আগে তুমি শিখে লও প্রথাগত নীতি, 
পরে কবি সৃষ্টি করো নব ছন্দরীতি । 
স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত অক্ষরবৃত্ত টি, 
লিখিবে শুদ্ধ কবিতা না করিবে ত্রুটি।
মুক্তক অতি মুক্তক অমিত্রাক্ষর কি ? 
গৈরিশ ও গদ্যছন্দ মাত্রা বুঝে লিখি । 
অমিল সমিল সবি অন্ত্যমিলে খুঁজে , 
মাত্রা হিসেব করিয়া নিতে হবে বুঝে । 
ছন্দের নিয়মে আছে খুঁটিনাটি যত , 
ব্যকরণ জেনে বুঝে করিবে আয়ত্ত। 
না বুঝে করিলে কিছু ফলাফল মন্দ, 
কবিতায় প্রয়োজন শিল্পগুণে ছন্দ । 
ছন্দরীতি কবিগণ করে যত সৃষ্টি , 
প্রতিভায় যোগ হবে প্রসন্ন সুদৃষ্টি । 

কলম একাডেমি লন্ডন ও কলম টিভি'র প্রতিষ্ঠাতা- অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাবিবী ২০২২ খ্রীস্টাব্দে একাডেমির পক্ষ থেকে কবি মাজেদুল হককে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ, তাঁর সাহিত্য চিন্তার আলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে "বিরহী কবি" উপাধিতে ভূষিত করেন। 

প্রকৃতপক্ষে বিরহী কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল সাহিত্যের ধ্রুপদী কবি,তাঁর কাব্যিক শৈলী অনন্য। 

কবি মাজেদুল হক বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলার সদর উপজেলায় পাটলী গ্রামে ১৯৭৭ খ্রীস্টাব্দে ৩ জুলাই (১৯ আষাঢ়) সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। 
পিতা - এস এম কিতাব আলী, মাতা- বেগম আয়েশা খাতুন। 

কিশোর বয়স থেকে কবির লেখালেখির হাতেখড়ি, বি এ অধ্যয়নরত সময়ে তাঁর লেখা প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং এখনও নিয়মিত স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে বিরহী কবির লেখা। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত কবির কর্মব্যস্ত জীবন তারপরেও সময় সুযোগে চালিয়ে যাচ্ছেন কবির সৃজনশীল লেখনী। 

২০১৭ খ্রীস্টাব্দে মুক্তির আশা ও নেত্রের আশা পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে ছড়া প্রতিযোগিতায় সেরা ছড়াকার নির্বাচিত হওয়ায় নেত্রকোণা জেলা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে তৎকালীন দ্বায়িত্বরত জেলা প্রশাসক ডক্টর মুশফিকুর রহমান কবির হাতে সম্মাননা স্মারক (সেরা ছড়াকার সম্মাননা)  তুলে দেন এবং দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার কবিকে "উত্তরীয়" পড়িয়ে সম্মানিত করেন। 

কবি মাজেদুল হক শিশুদের জন্যে লিখেছেন শিক্ষামূলক শিশুতোষ ছড়া, যা পড়ে শিশুরা শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হবে এবং আদর্শিক চরিত্র গঠনে উৎসাহিত হবে।

   ছড়াকে সজ্ঞায়িত করিতে কবি ছড়া শিরোনামে লিখেছেন- 

ছড়া 

ছড়ায় যদি ছন্দ থাকে 
পড়তে লাগে ভাল-ও,
ছন্দ ছাড়া অনেক ছড়া 
পায় না খুঁজে তাল-ও। 

ছন্দ ছাড়া লিখেন ছড়া 
দোষ রয়ে যায় দু'টি, 
মাত্রা হিসেব ঠিক থাকে না 
তাল লয়ে হয় ত্রুটি। 

অন্ত্যমিলে লিখেন ছড়া 
ঠিক না রেখে ছন্দ, 
এমন ছড়া নিয়ে আছে 
ছান্দসিকের দ্বন্দ্ব।

পাঠক পড়ে তৃপ্তি পেলে 
সেই ছড়াটি বেশ, 
ভালো ছড়ায় আলো ছড়ায় 
মজার নেইতো শেষ। 

 ছেলের প্রতি বাবার উপদেশ, শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন কবি তাঁর পড়তে হবে শিরোনামের ছড়ায়-

পড়তে হবে 

ছুটির দিনে মনের সুখে 
চলছে খোকা মাঠে, 
বাবার সাথে দিন-দুপুরে 
ইচ্ছে মতো খাটে। 

মাঠের ধূলি খোকার গায়ে 
সবই গেল মেখে, 
এখন খোকা কাজের ছেলে 
হাসছে বাবা দেখে। 

রোদের তাপে ঘামছে খোকা 
বাবায় বলে রাখো, 
গাছের ছায়া জুড়ায় দেহ 
একটু বসে থাকো। 

বুঝায় বাবা পড়তে হবে 
রাখিস মনে খোকা, 
মূর্খ হলে সুযোগ বুঝে 
দেয় মানুষে ধোকা। 

প্রতিটি সন্তানের প্রথম শিক্ষক তার মা,
মায়ের হাতে সন্তানের শিক্ষার হাতেখড়ি। আদর্শবান সন্তান গড়ে উঠুক প্রত্যেক ঘরে ঘরে। সেই চিন্তাভাবনায়, সন্তানের প্রতি মায়ের আদর সুলভ শাসন এবং বিচার কে কবি মায়ের আদালত শিরোনামের ছড়ায় তুলে ধরেছেন-

মায়ের আদালত 

খেলার শেষে ক্লান্ত হয়ে 
ঢুকছে খোকা ঘরে, 
বলছে মায়ে দাঁড়াও খোকা 
চলবে হিসেব করে। 

খেলতে গিয়ে ঝগড়া করো 
রোজই আসে নালিশ, 
তোমার স্বভাব এমন কেন 
করব কত সালিশ  ? 

ঝগড়া আমি করবো না মা 
মাফ করে দাও আজি,
ভুল হয়েছে কান ধরেছি 
আদেশ মানতে রাজি। 

খোকার চোখে অশ্রু দেখে 
নিলেন টেনে বুকে, 
আঁচল দিয়া চোখ মুছিয়া 
চুমু দিলেন মুখে। 

শিশুর যত বিচার আসে 
খেলার উঠোন হতে, 
এসব কিছু ফয়সালা হয় 
মায়ের আদালতে। 

এখন বিজ্ঞানের যুগ তারপরেও কিছু কিছু মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত তাই কবি অচেতন জাতিকে সচেতনতার ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর ভূতের বাড়ি শিরোনামের ছড়ায়-

ভূতের বাড়ি 

পুকুর পাড়ে ঝোপের ধারে 
ঐ যে তেঁতুল গাছে, 
রাত নিশিতে পায় দেখিতে 
ভূত-পেতিনি নাচে। 

মনের ভয়ে বউ-ঝি লয়ে 
দেয় না এ পথ পাড়ি, 
বলছে সবে এটাই তবে 
হয়তো ভূতের বাড়ি। 

জোয়ান নারী রঙিন শাড়ি 
সেদিন গেল পরে, 
ভূতের নজর করছে আছর 
রয় না এখন ঘরে। 

ওঝায় গিয়ে ঝাড়ফুঁক দিয়ে 
বলছে এটা দৃষ্টি, 
ডাক্তার বলে টেনশন হলে 
হয় মনোরোগ সৃষ্টি। 

ঔষধ খেয়ে সুস্থ মেয়ে 
নেইতো কোনো রোগ, 
ভূতের গল্প গুজব অল্প 
মিথ্যে অভিযোগ। 

২০২৪ খ্রীস্টাব্দে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য হাজার কবির কবিতা সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে বিরহী কবিকে "জহিরুল সাহিত্য পুরষ্কার " প্রধান করেন। 

প্রতি বছর স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী কবি মাজেদুল হকের কবিতা আবৃত্তি করে অর্জন করছে বার্ষিক পুরস্কার। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার আবৃত্তি শিল্পী আবৃত্তি করেছেন কবির কবিতা এবং ভারতের অনেক সুনামধন্য আবৃত্তি শিল্পী আবৃত্তি করেছেন বিরহী কবির কবিতা তাই বিরহী কবি মাজেদুল হক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গণে হয়েছেন সমাদৃত। 

কবিতা কে সজ্ঞায়িত করিতে গিয়ে কবি মাজেদুল হক কবিতা শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

কবিতা, 
ক - বি - তা -  ;
কবি বিবেক তাপস, 
জীবন প্রেম যশ । 

কবি,
ক - বি -  ;
কথা বিশ্লেষক, 
শব্দের অন্বেষক। 

বিবেক,
বি - বে - ক -  ;
বিষয় বেষ্টিত করণ, 
বাক্যে ছন্দের প্রকরণ। 

তাপস, 
তা - প - স -  ;
তালাস পণ্ডিত সঞ্চয়, 
বিচিত্র জ্ঞানের সমন্বয়। 

কৈশোরে যখন প্রেম আসে কবির জীবনে, কবি প্রেম শিরোনামের কবিতায় লিখেন তাঁর সরল মনের কাব্যিক বাণী- 

প্রেম 

শুনেছি লোকের মুখে 
প্রেম করে সাধু, 
মনের প্রকৃত আকর্ষণ 
নয় কোনো যাদু। 

জেনেছি জ্ঞানীর কাছে 
খাঁটি প্রেম করিলে, 
সুখের অমৃত স্বাদ 
প্রেমিকের ভাগ্যে মিলে। 

দেখেছি জগতের মাঝে 
সত্যিকার প্রেমিক যাঁরা, 
মরিতে বাধ্য তবুও 
প্রেম ভুলে না তাঁরা।

বুঝেছি প্রেম আসলেই 
স্রষ্টার অতুলনীয় দান, 
তাই একজনের প্রতি 
আরেক জনের আত্মার টান। 

এক মূহুর্ত না দেখিলে কবির প্রিয়া কবিকে দেখার জন্য চাতকিনীর মতো অপেক্ষা করিতো তাই কবি অপেক্ষা শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

অপেক্ষা 

কথা ছিল তুমি আসবে 
আশায় রয়েছি আজও পথ চেয়ে-
একাকী জীবন কত কষ্টের 
তুমি কি একটু বুঝও  ? 
মাঝ রাতে হঠাৎ শুনি তোমার কন্ঠ-
দরজায় কড়া নেড়ে ডাকছো আমায় 
এই, শুনছো ? 
দরজা খোলো, কী হলো ? 
দরজা খোলও ! 
শিশুর মতো চমকে উঠি 
দু'চোখ কচলাতে কচলাতে 
বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলি 
চেয়ে দেখি তুমি নেই ! 
দিবালোকে জানালার পাশে দাঁড়াই 
চেয়ে থাকি সুদূর পথে-
হঠাৎ দেখি তুমি আসছো ! 
এক লাফে চৌকাঠ পেড়িয়ে 
দাঁড়াই বাড়ির সামনে 
কাছে এলে দেখি, তুমি না ! 
তোমার মতো অন্য কেউ 
এখন তোমায় খুঁজে অস্থির 
অপেক্ষায় প্রতিটি প্রহর যেন হাজার বছর ! 


হঠাৎ যখন সামাজিক ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে দেয় কবির প্রীতির বন্ধন, প্রিয়া হারানোর বিরহ ব্যথায় ব্যথিত বিরহী কবি অপহরণ শিরোনামের কবিতায় লিখেন-

অপহরণ 

মনের মিলন ছিল দু'জনের মাঝে, 
মিলেমিশে চলিতাম খেলাধুলা কাজে ;
আমায় দেখিতো যদি,
 বলিত দরদী-
তোমায় দেখিলে আমি আনন্দে বিভোর, 
মনের গহীনে বাঁশি বাজে সুমধুর । 

হাসি মুখে কাছে এসে দু'হাত বাড়িয়ে, 
বুকের সাথে আমায় ধরিতো জড়িয়ে ;
বিনয় করি তোমায় 
ভুলো না আমায়- 
তোমাকে না পেলে আমি কিন্তু মরে যাবো, 
জানি না আমায় নিয়ে তুমি কিযে ভাবো। 

তাহার মাথায় রেখে আমার দু'হাত,
কসম দিয়েছে মোরে থাকিতে হায়াত ;
হয়তো ঝড় উঠিবে 
কত কি বলিবে-
ছাড়িয়া যাবে না মোরে দু'টি পায়ে ধরি, 
তোমার জীবন সাথী হয়ে যেন মরি। 

গোপনে অভিভাবক শাসন করিল, 
যড়যন্ত্র করে তাকে নির্বাসন দিল ;
শুনিয়া বিবেকে বাঁধে 
এখনো সে কাঁদে-
অধ্যয়নরত আমি তখন ছিলাম, 
পরিস্থিতির কারণে কষ্টই পেলাম। 

বিধির কিযে বিধান পারি না বুঝিতে, 
প্রিয়জন কেড়ে নিলো কঠোর নীতিতে ;
ব্যথার দু'টি পাহাড় 
শুধু হাহাকার-
সে কাঁদে আমিও কাঁদি ব্যথিত দু'জন, 
বিয়ের নামে হয়েছে সে অপহরণ। 

জোরপূর্বক অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার পরেও যেহেতু কবির প্রিয়া কবির জন্যে কাঁদে তখন বিরহী কবি নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে, ব্যর্থতা শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

ব্যর্থতা 

সবিনয়ে তুমি সামনে দাঁড়িয়ে, 
যুগল আঁখির দৃষ্টি বাড়িয়ে ;
প্রস্তাব দিলে, 
ক্ষতি কি তোমার সাথী করে দিলে ? 

নিরুপায় আমি উত্তর দিতে, 
আশায় ছিলাম সাথী করে নিতে ;
ভয় ছিল তবু, 
শপথ রাখিতে না পারিলে কভু। 

দিবানিশি তুমি প্রহর গুনিতে, 
কি জবাব দেব নীরবে শুনিতে ;
ফেলে আঁখিজল, 
সময় সুযোগে বলিতে সকল। 

ভরসা ছিল না এতটুকু মনে, 
সুদিন আসিবে আলোকিত ক্ষণে ;
বেকার ছিলাম, 
প্রেমকে জ্যান্ত করব দিলাম। 

চাকুরিটা পেয়ে আসিলাম ছুটে, 
কে যেন তোমায় নিয়ে গেল লুটে ;
বড়লোক স্বামী, 
এখন সমাজে লুটেরাই দামী। 

ব্যর্থতা এটা বলিনি ভাষায়, 
কিছুদিন তুমি থাকিও আশায় ;
লুকোচুরি খেলা, 
না পেয়ে আমায় তুমি চলে গেলা। 

পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যখন জোরপূর্বক কবির প্রিয়াকে অন্যের ঘরে দেওয়া হয় তখন বান্ধবীরা কবিকে শান্তনা দিতে গিয়ে কবির হৃদয়ে ঠাঁই নিতে প্রচেষ্টা চালায়, এমন প্রস্তাব কবি প্রত্যাখ্যান করিতে, কাব্যিক ভাষায় বোঝালেন-

তোমাদের পাশে প্রতিদিন এসে 
আর কিছু বলব না,
যদিও দেখা হয় সময় থাকবে স্বল্পময়
হৃদয়ের ভাষা বুঝাতে পারব না। 

কবি যখন প্রিয়া হারিয়ে একাকীত্ব জীবন তখন কবির বন্ধুরা মিলে কবির খোঁজখবর নিতে ব্যস্ত,  অনেকেই জিজ্ঞেস করে মনের অবস্থা জানিতে চাইলে, কবি বলেন-

বিরহ আমার পুঁজি, 
সুখের ঠিকানা খুঁজি। 

বিরহী কবির ছান্দসিক পংঙি বন্ধুদের মুখে মুখে রটে যায় চতুর্দিকে। 

ভালোবাসার বন্ধন বিচ্ছিন্ন হওয়ার দীর্ঘদিন পরে যখন হঠাৎ সাক্ষাৎ হয়ে যায় দুজনের তখন সেই মূহুর্তের মনোভাব উপলব্ধি করে বিরহী কবি সাক্ষাৎ শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

সাক্ষাৎ 

পথিক তুমি কে ? 
এভাবে চাহিলে যে আমার দিকে ! 
পরিচয় দাও চেনা প্রয়োজন, 
দেখে মনে হয় শত বছরের পরিচিত প্রিয়জন। 

মুখ তুলে চাও, 
কি বলিবে তুমি সোজা বলে যাও ;
অতীতে ছিল কি কোন লেনাদেনা ? 
চোখে চোখ রেখে বলো অভিমান করে কিছু লুকাবে না। 

মুখোশ খুলিয়া, 
অবুঝের মতো নীরবে কাঁদিয়া ;
বলিতে লাগিল ছিল যত মনে, 
তুমি ভুলে গেছো আমিতো পারিনা নিত্য ভাসে নয়নে। 

মুখ দেখে বুঝি, 
বহুদিন পরে সে পেয়েছে খুঁজি ;
উভয়ের মনে শুধু হাহাকার, 
দু'চোখের জল মুছাবার মতো নেই আজ অধিকার। 

ইশারা করিছে, 
চলে যেতে হবে লোকটি আসিছে ;
বুঝেছি লোকটি তাহার এখন, 
ধর্মের নীতি সংসার প্রীতি সবটুকু প্রয়োজন। 

থাকিতে হায়াৎ , 
কভু দু'জনে কি হবে সাক্ষাৎ  ? 
নিয়ে গেল তাঁকে নিদয়ার মত, 
সে তাকায় ফিরে তাই চেয়ে থাকি হৃদয়ে রয়েছে ক্ষত। 

পরের ঘরে দিনযাপন করেও যখন কবির বিরহীনি প্রিয়া কবিকে নিয়ে এবং কবির দেওয়া উপহার নিয়ে স্মৃতিচারণ করে, সেই মানসী প্রিয়ার স্মৃতি চারণ নিয়ে নাকফুল শিরোনামের কবিতায় কবি লিখেছেন-

নাকফুল 

আয়নায় মুখ দেখি যতবার নাকফুল চোখে পরে, 
নাকফুলে তাঁর ঝলমলে মুখ চাঁদের আলোয় ভরে। 
এই সেই স্মৃতি অমর কীর্তি আধু , 
কেঁদে ওঠে মন কেউ করে নাই যাদু । 
ঐ নাকফুল তাহার দেওয়া উপহার প্রীতিময়, 
হৃদয় গগণে আলোকিত চাঁদ অমলিন হয়ে রয়। 
শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে সেই ছবি, 
সেতো প্রাণপ্রিয় আমার বিরহী কবি। 
কতকিছু কথা অন্তরে গাঁথা হয়তো জানে না কেউ,
অকুল সাগরে পদ্মের মতো অবিকল ভাসে ঢেউ । 
কৈশোরে ছিল দু'জনের মাঝে প্রীতি, 
ভাগ্যের খেলা হয়েছে বিরহ গীতি। 
ভালো থেকো আজি প্রার্থনা মোর জীবন হল নাটক, 
এখনো তোমায় ভালোবাসি বলে হয়ে গেলাম পাঠক। 
মনের শান্তি মিলেছে তোমার কাছে, 
মনে হলে প্রাণ পাখি আনন্দে নাচে। 
হাজার বছর সাধনা করেও মিলে না এমন সুখ, 
আদর সোহাগে ভরে দিলে তুমি আমার কোমল বুক।

কবি প্রিয়া হারানোর ব্যথায় যেমন ব্যথিত তেমনি অসহায় বঞ্চিত মানুষের কষ্টের আর্তনাদ শুনেও তিনি ব্যথিত তাই কাব্যিক শৈলীতে অবলীলায় তুলে ধরেছেন অসহায় মানুষের কষ্টের আর্তনাদ তাঁর কবিতায়। 

অসহায় বঞ্চিত মানুষের প্রতি কবির ভালোবাসা ও সমবেদনা বুঝাতে, সহানুভূতি শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

সহানুভূতি 

স্রষ্টার কাছে মানুষ সবাই সমান, 
রক্তে মাংসে গড়া দেহ নাহি ব্যবধান। 
অন্ধ ল্যাংড়া হাবা বোবা যত সৃষ্টি ভবে, 
স্রষ্টা করেছেন সৃষ্টি বিভেদ কি তবে ? 
নারী পুরুষের মাঝে অঙ্গ ব্যবধান, 
সৃষ্টির রহস্য এটা কত সুমহান । 
যত প্রতিবন্ধী আছে মানুষ ওরাও, 
অবহেলা কর না তুমি পাশে দাঁড়াও। 
তুমি ভালো, প্রতিবন্ধী হতে কতক্ষণ, 
দুর্ঘটনায় হারায় অঙ্গ বহুজন। 
সাহায্যের লাগি ঘুরে দরিদ্র ভিখারি, 
ধনীও ভিক্ষুক সাজে ইশারা উনারি। 
করো না বড়াই কভু গর্ব অহংকার, 
জীবন থাকিতে করিও পরোপকার। 
মনে রাখিবে মানুষ,মানুষের জন্য, 
মানব সেবা করিলে হবেই সে ধন্য। 
জীবের প্রতি দেখাবে যে সহানুভূতি, 
পরোপকার করিবে মনে প্রতিশ্রুতি। 

মানুষ দুনিয়ার সাংসারিক মায়ায় পড়ে স্বার্থপর হয়ে যায় এবং পরোকালের চিন্তা ভুলে যায়, কবি মানুষ কে পরকালের কথা স্বরণ করিয়ে ধর্মাবলম্বী হওয়ার জন্য নির্দেশ দিতে মালিকানা শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

মালিকানা 

অর্থ বিত্ত রত্ন সবি কষ্টের ফসল, 
জীবন চলার পথে একান্ত সম্বল। 
মৃত্যুর পরে সম্পদ অন্যজনে পাবে, 
এমন ভাবনা কভু মানুষ কি ভাবে ? 
উত্তরাধিকারী সুত্রে হবে ভাগাভাগি, 
পরিশ্রম করি তবু সম্পদের লাগি। 
অর্থের লোভে জগতে এত যে বাহানা, 
মরণোত্তর সন্তান পাবে মালিকানা । 
যতটুকু ভাগ্যে আছে না হলে সবুর,
পূরণ হবে না আশা গেলে বহুদূর । 
ক্ষণিকের খেলাঘরে অতিথি সবাই, 
অধিকার নিয়ে কেন এতোটা বড়াই ? 
অন্যের ভান্ডার যদি করো আহরণ, 
হিসেব দিতেই হবে রাখিও স্বরণ । 
সততাই মূলধন মনে রেখো সবে , 
সুপথে রোজী তোমার উন্নয়ন হবে। 
অনন্ত বছর তুমি যেখানে রহিবে , 
কামাই করেছো কিছু পরোপারে নিবে ? 

কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ, এখানে বেশির ভাগ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল আর হতদরিদ্র কৃষকের অভাব অভিযোগের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বিরহী কবি তাঁর বর্গাচাষী শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন-

বর্গাচাষী 

বসত ভিটায় আছে ভূমি অল্লখান,
তাহার কাছে এটাই অতি মূল্যবান। 
পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছে এতটুকু বাড়ি, 
অভাব ও অভিযোগে চলেছে সংসারী। 
চাষের জমি নিজের না থাকায় মাঠে, 
পরের জমিতে চাষি বর্গাভাষে খাটে। 
খড়ের ছাউনি চালে পাটখড়িতে বেড়া,
বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়ে ঘর ভিজে নেড়া। 
ক্ষেতের ফসল বর্গা চলে না খোরাকী, 
অর্ধেক খোরাক চলে অর্ধ রয় বাকি। 
কয়েক মাসের খাদ্য চলে বর্গাচাষে, 
বাকি খোরাক তাহার কর্জ করে আসে। 
কার্তিক চৈত্রে উপোষ জুটে না খাবার, 
বাজার হতে কিনিয়া আনিছে আহার। 
শ্রমের টাকায় চলে সংসার অভাবে, 
রূজি না হলে সুদের টাকায় চালাবে। 
মহাজনের সুদের টাকা দিতে গিয়ে, 
ঘরে ফিরে চাষি চোখে অশ্রুঝর্ণা নিয়ে। 
অর্থের অভাবে চাষি পরিশ্রম করে, 
পরের বাড়িতে খাটে সে পরের ঘরে। 
অভাব অভিযোগে সে মুখে লয়ে হাসি, 
সংসার চালায় তবু সুখে বারোমাসি। 


তিনি কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন গান,ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস, সাহিত্যের প্রত্যেক শাখায় রয়েছে বিরহী কবির সার্থক বিচরণ। 

নিজের প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও শতাধিক সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে বিরহী কবির কবিতা। 

কবি মাজেদুল হকের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় বিরহের সুনিপুণ কারুকার্য। বাংলা সাহিত্যে তিনি  উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বিরহের নৈপুণ্যতায় অদ্বিতীয় তাই পাঠকের কন্ঠে কাব্যিক উচ্চারণ বিরহের আরেক নাম কবি মাজেদুল হক, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমালোচকগণ বিরহী কবি হিসেবে তাঁকে সমাদৃত করেছেন।
কমেন্ট বক্স