বাংলার প্রতিচ্ছবি: সাগর শান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টেকনাফের অরক্ষিত উপকূল ও পাহাড়ঘেরা জনপদে আবারও ডালপালা মেলতে শুরু করেছে মানবপাচারের ভয়ংকর জাল। প্রলোভন কিংবা ভালো চাকরির আশ্বাসের দিন শেষ—এখন সরাসরি পথচারী বা সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে পাহাড়ি আস্তানায় জিম্মি করার মতো নৃশংস পথ বেছে নিয়েছে সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। মুক্তিপণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রতিবন্ধী কিশোর কিংবা স্কুলছাত্রকে গভীর সাগরে মালয়েশিগাগামী ট্রলারে তুলে দেওয়ার মতো লোমহর্ষক ঘটনা প্রমাণ করছে, টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় অপরাধের এই নেটওয়ার্ক কতখানি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না টেকনাফের এনামুল হক কায়েস। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। হ্নীলার একটি বনফুলের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করা কায়েস প্রায় ১০ দিন আগে হঠাৎ নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। পরে সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে নৌবাহিনীর উদ্ধার করা ৭৬ জনের তালিকায় মেলে তার নাম।
পরিবারের দাবি, কায়েসকে অপহরণের পর পাচারের উদ্দেশ্যে দালালদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। পরে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা করা হয় তাকে। কায়েসের মতো টেকনাফের আরও কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে অপহরণের পর সাগরপথে পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবম শ্রেণির ছাত্র আয়াত উল্লাহ, মো. জয়নাল ও ওয়াকিব উল্লাহ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক সংগ্রহের পাশাপাশি পাচারের জন্য মানুষ জোগাড় করতে অপহরণকেও প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে চক্রটি।
সাগরে পানি কমায় সক্রিয় সিন্ডিকেট
মূলত এই সময়ে সাগরে পানি কম থাকায় অর্থাৎ আবহাওয়া শান্ত থাকায় টেকনাফ উপকূলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারীরা। গত এক সপ্তাহে টেকনাফের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে সাগরপথে পাচারের সময় রোহিঙ্গাসহ অন্তত দেড় শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় আটক করা হয়েছে অন্তত ১৫ জন দালালকে। মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার উপকূলের অরক্ষিত ঘাট ও দুর্গম এলাকাগুলো ব্যবহার করে চলছে এই তৎপরতা।
অপহরণের শিকার স্কুলছাত্র আয়াত উল্লাহ জানায়, টার্মিনাল এলাকা থেকে ধরে নিয়ে তাকে মৌচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ের আস্তানায় জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রথমে ৩০ হাজার টাকায় এবং পরে আরও এক লাখ টাকায় দালালের হাতবদল হয় সে। প্রায় এক মাস পর কচ্ছপিয়া উপকূল থেকে একটি ট্রলারে তুলে তাকে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত নৌবাহিনীর তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে যায় সে।
পরিবারের অন্তহীন কান্না ও নিখোঁজের গল্প
টেকনাফের ঘরে ঘরে এখন এমন বহু বেদনার গল্প। আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারের নিখোঁজ যাত্রীদের একজন টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কৃষক বেলাল মিয়া। তিন সন্তানের জননী ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, স্বামীর সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা হয়েছিল—দালালরা জোর করে তাকে বোটে তুলে দিয়েছে। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই।
মানবাধিকার ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবপাচার, মাদক, চোরাচালান ও হুন্ডি চক্র পরস্পর সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এই অপরাধ দমন করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা
মানবপাচারের ঘটনায় নিয়মিত মামলা হলেও অধিকাংশ মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। জেলা পুলিশ ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ৬০০টির বেশি মানবপাচার মামলা হয়েছে, যার প্রায় ৪৮০টি মামলা এখনো বিচারাধীন। পৃথক ট্রাইব্যুনাল না থাকায় এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান জানান, অপহরণ ও মানবপাচার একই সূত্রে গাঁথা অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিপণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে অপহৃত ব্যক্তিদের মানবপাচারের শিকার করা হচ্ছে। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।