বাংলার প্রতিচ্ছবি:- দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে অন্তত ২২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার শিশু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা, সিরিঞ্জ, কিট এবং ল্যাব সক্ষমতার চরম ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতি এখন ‘মহামারি’ পর্যায়ে চলে গেছে। এই সংকটের জন্য বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ ও সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও জরুরি অবস্থা ঘোষণা বা কার্যকর জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অথচ দেশে হামের নমুনা পরীক্ষার একমাত্র কার্যকর ল্যাবটি মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ) অবস্থিত। আইসিডিডিআর’বি ও চট্টগ্রামের ল্যাবগুলো বর্তমানে বন্ধ থাকায় সারা দেশের চাপ পড়ছে একটিমাত্র ল্যাবে, যার দৈনিক সক্ষমতা মাত্র ১২০টি নমুনা। ইনস্টিটিউটের কাছে কিটের ভয়াবহ সংকট ছিল, তবে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ৬০টি কিটের একটি চালান পৌঁছেছে। চিকিৎসকদের মতে, অবকাঠামো না বাড়িয়ে চিকিৎসা খাতকে কুক্ষিগত করে রাখায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেনের মতে, হাম ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ টিকাদানের বিশাল ঘাটতি। তিনি সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, টিকা কেনায় গাফিলতি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এই বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অন্যদিকে, অধ্যাপক বেনজির আহমেদ মনে করেন, বর্তমান সরকারেরও আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে; কারণ পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কোনো স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। সাবেক ইপিআই কর্মকর্তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় 'অপারেশন প্ল্যান' (OP) বন্ধ করে দেওয়ার ফলে মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচিতে ধস নামে, যার খেসারত এখন দিচ্ছে শিশুরা।
বর্তমানে সরকার এক কোটি ৭০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কর্মসূচি শুরু করলেও সেখানেও দেখা দিয়েছে ‘মিক্সিং সিরিঞ্জ’-এর তীব্র সংকট। ২০ লাখ সিরিঞ্জ প্রয়োজন হলেও মজুত আছে মাত্র ৪৫ হাজারের মতো। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেছেন, গত আট বছর দেশে হামের কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পরিস্থিতিকে বিগত সরকারগুলোর ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দ্রুত দেশে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা না করলে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ আদেশ (Standing Order) জারি না করলে এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এক নজরে হাম পরিস্থিতি (মার্চ-এপ্রিল ২০২৬)
| ক্যাটাগরি | পরিসংখ্যান |
| মোট মৃত্যু | ২২৩ জন (প্রায়) |
| হাসপাতালে ভর্তি | প্রায় ২৫,০০০ শিশু |
| দৈনিক গড় ভর্তি | ২,০০০ জন |
| নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা | দিনে ১২০টি (আইপিএইচ ল্যাব) |
| টিকার লক্ষ্যমাত্রা | ১ কোটি ৭০ লাখ শিশু |
| সিরিঞ্জ সংকট | ২০ লাখের বিপরীতে মজুত ৪৫ হাজার |