ঢাকা | ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ইং | বঙ্গাব্দ

মুদ্রানীতি ঘোষণা হচ্ছে বৃহস্পতিবার, নেই কোনও স্বস্তির বার্তা

প্রকাশের তারিখ: জানুয়ারী ২৮, ২০২৬ ইং

ছবির ক্যাপশন:
ad728
বাংলার প্রতিচ্ছবি: ব্যাংকিং খাতের আস্থাহীনতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উচ্চ সুদের চাপে যখন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত হাঁসফাঁস করছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে—এই মুদ্রানীতিতে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী কিংবা আমানতকারীদের জন্য দৃশ্যমান কোনও স্বস্তির বার্তা থাকছে না।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় অনুমোদনের পর বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রানীতি বিবৃতি (এমপিএস) ঘোষণা করা হবে। নতুন নীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে একমাত্র অগ্রাধিকার ধরে রেখে আগের মতোই কঠোর বা সংকোচনমূলক অবস্থান বহাল রাখা হচ্ছে। ফলে নীতিগত সুদহার বা পলিসি রেপো রেট ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকছে।

মূল্যস্ফীতি কমলেও চাপ কাটেনি

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, মূল্যস্ফীতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কাগজে-কলমে সামান্য কমার আভাস মিললেও বাস্তবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। একসময় দুই অঙ্কে থাকা সার্বিক মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে নেমে আসে ৮.১৭ শতাংশে। কিন্তু নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮.২৯ ও ৮.৪৯ শতাংশে। খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং উৎপাদন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের বেশি, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে আছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার কমানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

কিন্তু বিনিয়োগ বাড়বে কীভাবে?

নীতিগতভাবে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার যুক্তি দিলেও অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বড় প্রশ্ন—উচ্চ সুদহার বহাল রেখে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে, যখন ব্যাংকগুলো নিজেরাই তারল্য সংকটে ভুগছে?

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল মুদ্রানীতির নয়—এটি একটি গভীর কাঠামোগত ও নৈতিক সংকট। বছরের পর বছর ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দায়মুক্তি এবং সাম্প্রতিক ব্যাংক রেজ্যুলেশনে লোকসানের বোঝা পরোক্ষভাবে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানোর ফলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমানত প্রবাহে। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে। ফলে সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও ঋণ বিতরণ বাড়ার বাস্তব সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

লক্ষ্যমাত্রা আর বাস্তবতার ফাঁক

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত অর্জন হয়েছে মাত্র ৬.৫-৬.৬ শতাংশের মতো। নতুন মুদ্রানীতিতে জুন-নাগাদ এই প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হলেও ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান পরিবেশে এটি বাস্তবসম্মত নয়।

তারা বলছেন, উচ্চ সুদ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই।

সুদের করিডরেও নেই বড় পরিবর্তন

নতুন মুদ্রানীতিতে শুধু রেপো হার নয়, সুদের হার করিডরের অন্যান্য সূচকেও বড় কোনও পরিবর্তন আসছে না। স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা, স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) নিম্নসীমা এবং ওভারনাইট রেপো হার প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।

ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি আমানত রেখে সামান্য কম সুদ পেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার খরচ কমছে না। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার পরিস্থিতি আপাতত বহাল থাকছে।

বর্তমানে গড় ঋণ সুদহার ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

ঢিল দেওয়ার সুযোগ ছিল: অর্থনীতিবিদদের মত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুদ্রানীতিতে কিছুটা শিথিলতার সুযোগ ছিল। তার মতে, ডলারের বাজার এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, আমদানির খরচ আগের মতো চাপ সৃষ্টি করছে না। এই অবস্থায় পুরোপুরি সংকোচনমূলক নীতিতে আটকে থাকার প্রয়োজন ছিল না।

অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি যদি ধীরে ধীরে ৭-৮ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরবে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ হবে এবং কর্মসংস্থানেও গতি আসবে। তবে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনও সময় লাগবে।

গভর্নরের যুক্তি ও ফরেক্স বাজারের অগ্রগতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্বীকার করেছেন, ব্যবসায়ীদের সুদহার কমানোর দাবির যৌক্তিকতা আছে। তবে তার ভাষায়, এখনও নীতিগতভাবে সেই সুযোগ তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ওপরে ছিল, এখন তা ৮ শতাংশের ঘরে এসেছে—এটা অগ্রগতি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য আরও নিচে নামানো। মানুষের মধ্যে যে ‘দাম বাড়বেই’—এই মানসিকতা ঢুকে গেছে, তা ভাঙতে সময় লাগে।”

ফরেক্স বাজারের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে এক ডলারও বিক্রি করেনি, বরং বাজার থেকেই প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এতে রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং কারেন্ট ও ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট দুটোই তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক সূচকে শৃঙ্খলা আনতে পারে। তবে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে এই কঠোর নীতি বাস্তব অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল আনবে না।

বরং ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন—নতুন মুদ্রানীতিও আগের মতোই কাগজে শক্ত, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় দুর্বল থেকে যাবে।
কমেন্ট বক্স