
বাংলার প্রতিচ্ছবি: বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের মন্দা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে একেবারে নতুন বিদেশি মূলধন বা নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে মোট নিট এফডিআইয়ের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, পুরোনো কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করলেও নতুন বিদেশি উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে নতুন প্রকল্প শুরু করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
পরিসংখ্যান ও বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন পুঁজি প্রবাহ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কমেছে। অন্যদিকে, নতুন ইক্যুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ মিলিয়ে সামগ্রিক নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে (আগের বছর যা ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার)। তবে এই সময়ে পুরোনো বিনিয়োগকারীদের পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ ১৯ কোটি ১২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে মোট এফডিআইয়ের বড় অংশই এসেছে পুরোনোদের কাছ থেকে, নতুনদের থেকে নয়।
বিনিয়োগকারীদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ: বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্পে অর্থ লগ্নির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সোভরেন ক্রেডিট রেটিং একাধিকবার অবনমিত হওয়া, ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অর্জিত মুনাফা সহজে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থাকে দুর্বল করেছে।
আফ্রিকার দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ: জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আফ্রিকার তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে উগান্ডা ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং ঘানা ও ডিআর কঙ্গো ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার করে এফডিআই পেয়েছে। ঘানা একাধিক কর বাতিল ও রিজার্ভ শক্তিশালী করে, উগান্ডা কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করে এবং কঙ্গো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও জ্বালানি খাত উন্মুক্ত করে বিনিয়োগ টানতে পারলেও বাংলাদেশ প্রশাসনিক জটিলতা, জ্বালানি সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তা কাটাতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও উত্তরণের পথ: সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান বাধা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় ও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া দূর না হলে বিনিয়োগে বড় পরিবর্তন আসবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, শুধু ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিয়ে বড় বিনিয়োগ আসবে না; এর জন্য বে-টার্মিনালের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন সরকার যদি দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা এবং সহজে মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারে, তবেই বিদেশি বিনিয়োগের গতি ফিরবে।